গাহি সাম্যের গান: অধর্মের চেয়ে মনুষ্যত্ব হোক মহান - সব খবর | Sob khobar
  1. admin@sobkhobar.com : admin :
  2. editor@sobkhobar.com : editor :
গাহি সাম্যের গান: অধর্মের চেয়ে মনুষ্যত্ব হোক মহান - সব খবর | Sob khobar




গাহি সাম্যের গান: অধর্মের চেয়ে মনুষ্যত্ব হোক মহান

সব খবর রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১
  • ৬২ জন পড়েছে

কাজী একে এম রাসেল : আমার মায়ের এক অদ্ভুত বিরল রোগ আছে হুটহাট রক্ত কমে যায়,রক্তের অনুচক্রিকার সংখ্যা কম থাকে।চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় রোগটার একটা নাম ও আছে, সেটা এখন বিবেচ্য বিষয় না।

হঠাৎ বছর খানেক আগে রক্ত কমে গেছিলো তিন ব্যাগ রক্ত লাগবে,তখন কভিড আসি আসি করছে,এসেও গেছে।আমার বাসার কারো সাথে আমার মায়ের রক্তের গ্রুপের মিল নেই। তাই নিজেরা দিতে পারিনি। তখন অনেকের ভয় হাসপাতালে আসা কিংবা রক্ত দিতেও।রক্ত দিলে যদি ইমিউনিটি কমে যায়।  ডোনার পাওয়া যাচ্ছিল না।  কেউ কেউ রাজি হয়। কেউ নিজের রোগের বাহানা দেয়,কেউ ঐ দিনে এভেইলেবল না, প্রত্যেকেই ব্যস্ত। হঠাৎ সহকর্মী কেউ কেউ এলেন, এলেন পরিচিত অনেকেই রক্ত দিতে। কারো ব্লাডপ্রেশার খুব কম। প্যাথলজিস্ট জানালেন যাদের ব্লাডপ্রেশার খুব কম তাদের রক্ত না টানাই ভালো। এক ঘনিষ্ট ছোট ভাই এলো বন্যার পানিতে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় অনেক রাস্তা ঘুরে, চাকরি সূত্রে পরিচয়। সে কখনো রক্ত দেয়নি।তার ভয় ছিলো জীবনের প্রথম রক্ত দিচ্ছে সে। সে নিজেই সাহস সঞ্চয় করলো। রক্ত দিলো তার প্রভুর নাম করে।  আমার মায়ের রক্তশূন্যতা ঠিক হলো। অণুচক্রিকা আগের মতো ই কম থাকলো।আমার মায়ের একটু সুস্থ লাগা শুরু হলো। আমার মা বললেন,”কে কে রক্ত দিয়েছে?” নামগুলো বললাম সঙ্কোচ নিয়ে।ক ারণ যদি তিনিও তথাকথিত অন্য সবার মতো হোন। কারণ তিনজন রক্তদাতার মধ্যে একজন ছিলেন হিন্দু। এবং জীবনের প্রথম সে রক্ত দিয়েছে আমার মাকেই। কিন্তু সব শুনে আমার মা আমাকে অবাক করে দিলেন,”তিনি বললেন তাহলে সেই ছেলে তো আমার ছেলে কিংবা আমার বাবার মতো, তার রক্ত আমার শরীরে।”

আমার মায়ের খুব ইচ্ছে সুস্থ হয়ে তাকে নিজে রেধে খাওয়াবে। মায়ের ও সুস্থ হয়ে উঠা সময় সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।তখন আমার মাকে মনে হচ্ছিলো দেবী পার্বতী। আমার মাকে দেবী পার্বতী উপমা দিলেই তিনি হিন্দু হয়ে যাবেন না,সেই ছেলেকে আমার মা নিজের ছেলে বলে ডালভাত খাওয়ালেই সে মুসলিম হয়ে যাবেনা। সেই ছোট ভাইটির কথা আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি সবসময়। তাকে আমার আপন ভাই ই জেনে আসছি। একসাথে অনেক থেকেছি খেয়েছি সেই ভাইটির সাথে। তার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারিনি বলে সে মনে মনে অভিমান করেছে আমি জানি।

আমি এখনো ভাবি আমার দেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। এক দুজনের জন্য পুরো লজ্জার দায় আমি নেবোনা। কে সংখ্যালঘু কে সংখ্যাগুরু আমি সে হিসেবের খাতায় নেই।সংখ্যা মনুষ্যত্বের নির্ণায়ক হতে পারেনা। এই দেশ সবার। আমি ঘৃণা জানাই সেইসব পুর্বপুরুষদের যারা সংস্কৃতি আর সভ্যতার আর সাম্যতার ভিত্তিতে নয়; ধর্মের ভিত্তিতে সীমান্ত রেখা টেনে কারো কারো মনে ও সীমান্ত টেনে দিয়েছিলো। “যার যার ধর্ম তার তার।” আমার ধর্মগ্রন্থ আমিও পড়ি।আমি তো কোথাও পাইনি অন্যের ধর্মপালনে বাধা দিতে হবে। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো অন্য ধর্মের জন্য হুমকি হতে পারেনা। আমি লজ্জিত আমার সেই বন্ধুটির কাছে যার পূর্বের ১০০পুরুষ এই দেশের জাতিসত্ত্বায় বড় হয়ে আজ কষ্ট নিয়ে আমায় বলেছে,”এই দেশে হয়তো থাকা যাবেনা আর! যাবোই বা কোথায়?”

আমি তার প্রতি আমার লজ্জা জানাই। আমি লজ্জিত। আমি ধিক্কার জানাই তাদের যাদের জন্য আমার অসাম্প্রদায়িক দেশে একটি ধর্মীয় উৎসব নিরানন্দ হয়ে যাচ্ছিলো। এইসব শতবছর আগে বুঝতে পেরেই হয়তো সাম্যের কবি নজরুল গেয়ে উঠেছিলেন,  “মোরা এক ই বৃন্তে, দুটি ফুল হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন মনি, হিন্দু তাহার প্রাণ”

কভিড এ মৃত্যুর ত্রাহী ত্রাহী আর্তনাদে সবাই যেমন এক হয়েছিলাম। সেই এক আর ঐক্যবদ্ধ ই থাকতে চাই। আমার দেশ অসাম্প্রদায়িক। ধর্ম প্রতিষ্ঠা নয়,সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সাম্যের ভিত্তিতে আমার দেশের স্বাধীনতা এসেছিলো।

এই স্বাধীনতা সকলের। আমার দেশ আমার সরকার আমার সংবিধান চিরকাল অসাম্প্রদায়িক আছে, চিরকাল তাই থাকবে। আমি আমার সেই বন্ধুটিকে আশ্বস্ত করতে চাই এই দেশেই আমার কবরে ঠাই হবে,তোমার ও শ্মশানে ঠাই হবে।এক ই সৃষ্টিকর্তাকে আমি এক নামে বন্দনা করি, তুমি আরেক নামে বন্দনা করো। আমরা ভাই ভাই। সকলে মিলেই অধর্ম কে রুখে সাম্য আর মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই দেশ তোমার আমার সকলের।

লেখক: আবাসিক মেডিকেল অফিসার,  ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ।

 




Comments are closed.

এই বিভাগের আরো খবর




ফেসবুকে সব খবর