ডাক্তার, অধ্যাপক এবং শব্দের অধিকার - সব খবর | Sob khobar
  1. admin@sobkhobar.com : admin :
  2. editor@sobkhobar.com : editor :
ডাক্তার, অধ্যাপক এবং শব্দের অধিকার - সব খবর | Sob khobar




ডাক্তার, অধ্যাপক এবং শব্দের অধিকার

সব খবর রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৮১ জন পড়েছে

কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম, হাইকোর্টের একটি রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাড়া আর কেউ ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না।

মহামান্য হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, থাকতেই পারে না। কারণ, আইনগত বিষয়ের চূড়ান্ত বিবেচনার ভার আইনবিভাগের। সাধারণের এগুলোতে তেমন কোনো কর্তব্য নেই।

আমার বক্তব্য এই প্রেক্ষিতের ভাষাগত দিক নিয়ে।

একবার দুপ্রকের (দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি) কোনো-একটা প্রয়োজনে আমি ও অন্য সদস্যরা একটি সরকারি অফিসের কর্তার দফতরে গিয়েছিলাম।

সবার শেষে এলেন আমাদের কমিটির এক সদস্য, যিনি একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। পরিচয়পর্বে তিনি বললেন, ‘আমি ‘অমুক’ কলেজের অধ্যাপক’। সরকারি কর্মকর্তা তির্যক ভঙ্গিতে বললেন, ‘অধ্যাপক হয়ে গেছেন?’

তাঁর এই ভঙ্গিটি আমার খুব চোখে লাগলো।

ফেসবুকে একটা পোস্ট লিখেছিলাম। বিষয় : ‘জাইকার অপ্রয়োজনীয় সড়ক’ আমার বাবার স্মৃতিবাড়ির উপর চড়াও হতে চাচ্ছে। পোস্টের নিচে আমার পরিচিতি লিখেছিলাম। তাতে নামের আগে ‘অধ্যাপক’ শব্দটি লিখেছি, যা আমি সাধারণত লিখি না। আমি ওখানে শব্দটি লিখেছি পেশাগত পরিচয় হিসেবে, মোটেই পদবি হিসেবে নয়।

একজন পোস্টে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মন্তব্য করলেন, ‘অধ্যাপক’ হবে, নাকি ‘সহকারী অধ্যাপক’ হবে?

আমাদের চকরিয়ার প্রধান-কলেজটির অধ্যাপক এ কে এম গিয়াস উদ্দিন শিক্ষকতার পাশাপাশি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। আমি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া সাঙ্গ করে চকরিয়ায় ফিরে একটি কলেজের শিক্ষকতায় যোগ দিলে, তাঁর পত্রিকার কার্যালয় ঘিরেই আমাদের আড্ডা জমতো।

তিনি সৌখিন মানুষ। চকরিয়ার প্রথম সংবাদপত্রের তিনি মালিক ও সম্পাদক। চকরিয়াতে তিনিই প্রথম অ্যাপল মেকিন্টোশ কম্পিউটার কেনেন। প্রথম অফসেট ছাপাখানাও তাঁর।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁরই ল্যান্ডফোনের সংযোগ ছিলো। সেই ফোনে কাউকে কল করেই তিনি পরিচয় দিতেন, ‘আমি প্রফেসর গিয়াস বলছি’।

আমরা যারা ‘বিশুদ্ধবাদী’, তারা বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করতাম। মাঝে-মাঝে তাঁকে সরাসরিও এ নিয়ে কথা শোনাতাম। তিনি আমাদের বাক্যবাণে বিব্রত হতেন। আর বলতেন, ‘আমি পরিচয়দানপর্ব সহজ করার স্বার্থে ওই শব্দ ব্যবহার করেছি। নয়তো লোকে আমাকে চিনতে পারে না। প্রশ্ন করে, কোন গিয়াস?’

বাস্তবে টেলিফোনিক আলাপে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি তাঁর কথার সত্যতা। ওই পেশাশব্দটি নামের আগে জুড়ে না দিলে পরিচয়পর্বের অনর্থক প্রলম্বন ঘটে।

একবার দেখলাম, নির্ঝরের [ Nirzhar Noishabdya ] মতো মানুষকেও, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের ‘অধ্যাপক’ বলা নিয়ে শ্লেষাত্মক বাক্য ব্যবহার করতে।

লোকে প্রভাষক, সহকারী-সহযোগী অধ্যাপক চিনে না, চিনে প্রফেসর। চকরিয়া কলেজের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এর কারণ খুঁজে পেলাম।

আগের দিনে কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকমাত্রই ছিলেন ‘প্রফেসর’। ‘প্রভাষক’ বা ‘লেকচারার’ এমন কোনো শব্দই তখনকার দিনে ব্যবহার করা হতো না।

তাই লোকের কাছে কলেজশিক্ষক মাত্রই ‘প্রফেসর’ বা ‘অধ্যাপক’।

আপনারা জানবেন, কোনো শব্দের দু ধরনের ব্যবহার সমাজে প্রচলিত : সাধারণ অর্থ আর বিশেষ অর্থ। একই শব্দ পদার্থবিজ্ঞান আর ব্যাকরণে এক অর্থে ব্যবহৃত হয় না।

‘শক্তি’ ‘বল’ ‘ভর’ এগুলো বিজ্ঞানে যে অর্থে ব্যবহার করি, কেউ নিশ্চয় দাবি করবেন না, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও সেগুলোকে একই অর্থে ব্যবহার করবার।

তাহলে ‘অধ্যাপক’ শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে লোকের এতো অ্যালার্জি কেন?

এই শব্দের সাধারণ অর্থ হলো, বিশেষ পেশায় নিয়োজিত লোকসকল। আর বিশেষ অর্থ, ওই বিশেষ পেশার পদবির স্তরবিন্যাসজাত।

মানুষ যখন ‘অধ্যাপক’ বা ‘প্রফেসর’ বলে, তখন পেশার পরিচয় হিসেবে বলে, পদবিন্যাসগত স্তরের কথা বলে না।

আসুন, একবার শব্দকোষে চোখ বুলাই :

‘অধ্যাপক’ : ১. কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ২. শিক্ষাগুরু, ৩. শিক্ষকতার পদবিশেষ। [ আধুনিক বাংলা অভিধান। বাংলা একাডেমি। পৃষ্ঠা ৩৪ ]

‘অধ্যাপক’ : ১. শিক্ষক, ওস্তাদ, আচার্য। ২. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পদবিশেষ। [ ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। বাংলা একাডেমি। পৃষ্ঠা ২১ ]

এবার ধরুন : ব্যাংকে, বিমায় ‘প্রেসিডেন্ট’, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ ইত্যাদি পদনাম আছে, তাতে দেশের ‘প্রেসিডেন্ট’-এর কী যায় আসে?

কোম্পানিতে ‘সচিব’ আছে, ইউনিয়ন-পরিষদেও ‘সচিব’ আছে, আছে আরো অনেক জায়গাতে। তাতে সচিবালয়ের ‘সচিব’দের সচিবত্বের কোনো অসুবিধা বা হানি হয় বলে কখনো শুনিনি।

সম্প্রতি, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটা আজব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবং বেশ দ্রুততার সাথে তা বাস্তবায়ন করেছে।

তা হলো, ইন্টারমিডিয়েট কলেজে কোনো ‘অধ্যাপক’ পদ থাকবে না। এমনকি ‘সহযোগী’ বা ‘সহকারী’ লাগানো কোনো ‘অধ্যাপক’ পদও থাকবে না। অর্থাৎ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে ‘অধ্যাপক’মুক্ত।

আন্দোলনের বিষয়টি মাথায় রেখে, কেবল যারা আগেই ‘সহকারী অধ্যাপক’ হয়ে গেছেন তাদের মেনে নেওয়া হবে। নতুন কেউ অধ্যাপকযুক্ত পদবিধারী আর হতে পারবেন না।

এসব সিদ্ধান্ত নিশ্চয় বড়মাথার লোকেরা নেন। আমার মতো ছোটমাথার লোকের তাদের ভুল ধরার স্পর্ধা থাকা সমীচীন নয়।

বরং তাদের সিদ্ধান্তটিতে কিছু যোগ করতে চাই :

প্রস্তাব ১ : যেহেতু উচ্চমাধ্যমিক কলেজের শিক্ষকরা ‘অধ্যাপক’ শব্দের ঘ্রাণযুক্ত কিছু হতে পারবেন না, তাহলে ওই কলেজের প্রধান ‘অধ্যক্ষ’ পদবাচ্য থাকলে উচ্চতর প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষর বেইজ্জতি হয়। সুতরাং উচ্চমাধ্যমিক কলেজের প্রধানের জন্য নতুন পদনাম সৃজন করা হোক।

প্রস্তাব ২ : উচ্চমাধ্যমিক কলেজের ‘প্রদর্শক’, ‘অফিস সহকারী’, ‘আয়া’, ‘এমএলএসএস’ এদের সবার জন্য নতুন পদবাচক নাম আবিষ্কার করা হোক।

ডোবাবেন যদি, তরির সকলেই ডুবুক।

এবার আসি ‘ডাক্তার’ নিয়ে।

ডাক্তার মানে হলো, চিকিৎসাপ্রদানে নিয়োজিত ব্যক্তি। ‘ডাক্তার’ শব্দের ব্যবহার যদি অন্যায় হয়, তাহলে তার পক্ষে চিকিৎসাদানও অবৈধ হওয়া উচিত।

বাস্তবে দেখেছি, লোকে ‘ডাক্তার’ শব্দটি জেনেবুঝেই প্রয়োগ করে। তারা কখনোই এমবিবিএস ডাক্তার আর অন্যদের সমান করে বলে না। চট্টগ্রামে ওরা ‘ডাট্টর’ আর সনদপ্রাপ্তরা হলেন ‘বড্ডাট্টর’ (বড়ো ডাক্তার)।

সাধারণ মানুষের কাছে ফার্মেসি চালিয়ে ওষুধ বিলায় যে, সেও ‘ডাক্তার’। এই প্রয়োগগুলো থামাবেন কী করে?

আরেকটা কথা বলতেই হয়, যদি যথাযথ মানের সনদ ছাড়া কারও ‘ডাক্তার’ হওয়া অনুচিত হয়, তাহলে যথাযথ সনদ ছাড়াই ‘বিশেষজ্ঞ’ ডাক্তার লেখাও অবৈধ হওয়া উচিত।

পথচলতি দেখতে পাই, বিশেষজ্ঞ-ডাক্তার প্রমাণের জন্য ‘বিসিএস স্বাস্থ্য’, ‘এফসিপিএস পার্ট-ওয়ান’ ইত্যাদি লেখার সে কী কসরৎ!

অডাক্তারদের ‘ডাক্তার’ লেখায় যদি অন্যায় হয়, বিশেষজ্ঞ না হয়েও ‘বিশেষজ্ঞ’ লেখা, ‘বিশেষ-অভিজ্ঞ’ লিখে বিশেষজ্ঞ বোঝানোও কেন প্রতারণা হবে না?

অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন : ‘যাহারই গায়ে বল নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়।’

সমাজে এর সত্যতা দেখতে পাই।

লেখাটি Saifuddin Ahmed Nannu এর টাইমলাইন থেকে নেওয়া।




Comments are closed.

এই বিভাগের আরো খবর




ফেসবুকে সব খবর